বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৪ অপরাহ্ন
একুশের কণ্ঠ প্রতিবেদন:: বিদ্যুৎ খাতের জায়ান্ট সামিট পাওয়ার ও সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনী আজিজ খান পরিবার কর ফাঁকির অভিযোগে চাপের মুখে পড়েছে। সামিট পাওয়ার ও আজিজ খান পরিবারের সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ এনেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে সামিট পাওয়ার গত দুই বছরে এনবিআরের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে ২০টি রিট মামলা করেছে। তবে এবার কর ফাঁকির অর্থ আদায়ে সামিটের সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। ওই সাত পরিচালকই আজিজ খান পরিবারের সদস্য। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদ্যুৎ খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি সামিট পাওয়ার লিমিটেড। এর অধীনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এক ডজনের বেশি কোম্পানি রয়েছে। সামিট পাওয়ারের ৬৩ দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক সামিট করপোরেশন। ফলে সামিট পাওয়ারের মুনাফার ৬৩ দশমিক ১৯ শতাংশ ডিভিডেন্ড হিসেবে পায় সামিট করপোরেশন।
আবার সামিট করপোরেশনের প্রায় ৯৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল। ফলে সামিট করপোরেশনের আয়ও শেষ পর্যন্ত সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের কাছে যায়। অর্থাৎ সামিট পাওয়ারের আয় সামিট করপোরেশনের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালে স্থানান্তরিত হয়। এ লভ্যাংশ স্থানান্তরের সময় সামিট পাওয়ার থেকে সামিট করপোরেশনে অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে কর ফাঁকির অভিযোগ তুলেছে এনবিআর।
এনবিআরের নথি অনুযায়ী, আয়কর আইনের ১৪৩(৫) ধারা অনুসারে একটি কোম্পানি অন্য কোম্পানিকে ডিভিডেন্ড দিলে ২০ শতাংশ উৎসে কর দিতে হয়। ডিভিডেন্ড দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে এ কর কেটে এনবিআরের কোষাগারে জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে সামিট পাওয়ারের দাবি, বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানির আয় করমুক্ত। তাই ডিভিডেন্ডের ওপর উৎসে কর প্রযোজ্য নয়। এনবিআরের দাবির বিরুদ্ধে গত বছর উচ্চ আদালতে রিট করে সামিট। সাধারণত এ ধরনের কর ফাঁকির অভিযোগ সিভিল মামলা হিসেবে নিষ্পত্তি করে এনবিআর। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর আয়কর আইনে পরিবর্তন আনা হয়। এতে নথি জাল বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে কর ফাঁকি দিলে ফৌজদারি মামলা করার সুযোগ তৈরি হয়।
এ আইনের আওতায় এবার সামিটের সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। তারা হলেন- মোহাম্মদ আজিজ খান, আঞ্জুমান আজিজ খান, আদিবা আজিজ খান, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান, মোহাম্মদ লতিফ খান, মোহাম্মদ ফরিদ খান ও জাফর উমেদ খান।
এ বিষয়ে সামিট করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মোহসেনা হাসান কালবেলাকে বলেন, সামিট গ্রুপ সব সময় দেশের প্রচলিত আইন মেনে কর পরিশোধ করে আসছে। করপোরেট জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হিসাব ও আর্থিক বিষয় পরিচালনায় কেপিএমজি ও বেকার টিলির মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট সব দেশের আইন ও করবিধি মেনেই সামিট কর পরিশোধ করে। এনবিআরের সঙ্গে কোনো বিরোধ হলে তা আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। বিষয়গুলো বর্তমানে বিচারাধীন থাকায় এর বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বৃহৎ ১০ শিল্প গ্রুপের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত শুরু করে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা। এর অংশ হিসেবে সামিট পাওয়ার ও আজিজ খান পরিবারের কর ফাঁকির বিষয়ও অনুসন্ধান শুরু করে এনবিআরের প্রধান গোয়েন্দা দপ্তর সিআইসি।
সামিট পাওয়ারের ডিভিডেন্ডে উৎসে কর প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে অবশ্য আগেও আলোচনা হয়েছিল। বিষয়টি প্রথম সামনে আসে ২০২৩ সালে। তখন এনবিআরের কর অঞ্চল-১-এর এক কর্মকর্তা দাবি করেন, সামিট পাওয়ার সামিট করপোরেশনকে যে ডিভিডেন্ড দেয়, তাতে ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য। কিন্তু সামিট পাওয়ার এ আইন পরিপালন করেনি। বিষয়টি নজর এলে নথি যাচাই শুরু করেন কর অঞ্চল কর্মকর্তারা। একই বছর এনবিআর আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, সামিটের ডিভিডেন্ডে উৎসে কর প্রযোজ্য হবে না। ফলে তখন বিষয়টি আর এগোয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন করে তদন্ত শুরু হলে আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এনবিআর। নতুন ব্যাখ্যায় সংস্থাটি জানায়, সামিট পাওয়ারের ডিভিডেন্ডে ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য হবে।
এনবিআরের তথ্যে, ডিভিডেন্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে মোট ৯৬৩ কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সামিট পাওয়ার লিমিটেড ৭ বছরে ৩৮৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, সামিট গাজীপুর-২ লিমিটেড ৩ বছরে ১৭৬ কোটি ৫৭ লাখ, সামিট বরিশাল পাওয়ার লিমিটেড ৪ বছরে ৫৬ কোটি ২৬ লাখ, সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেড ৬ বছরে ৯২ কোটি ৮০ লাখ, সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার ইউনিট-২ তিন বছরে ২০ কোটি ৯ লাখ, সামিট এলএনজি টার্মিনাল প্রাইভেট লিমিটেড ৩ বছরে ১০০ কোটি ৬০ লাখ এবং সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার লিমিটেড ৬ বছরে ১২৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনের বিষয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য ও সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) সাবেক মহাপরিচালক মো. খাইরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, একটি কোম্পানি অন্য কোম্পানিতে ডিভিডেন্ড স্থানান্তর করলে ২০ শতাংশ হারে উৎসে কর প্রযোজ্য। তাই সামিটের ক্ষেত্রে এনবিআরের দাবিও যৌক্তিক।
সিআইসি ও কর অঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, ডিভিডেন্ডের পাশাপাশি সামিট গ্রুপের আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানের কর নথি ফের খতিয়ে দেখেছে এনবিআর। আয় গোপনসহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব নথি পুনঃউন্মোচন করা হয়।
এনবিআরের নথি অনুযায়ী, সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেড ৪ বছরে ৭৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার লিমিটেড ৫ বছরে ২৫১ কোটি ৯৫ লাখ এবং সামিট বরিশাল পাওয়ার লিমিটেড ৯ বছরে ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব নথিতে ১ হাজার ১৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকার কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
এনবিআরের এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে গেছে সামিট। গত দুই বছরে এনবিআরের বিরুদ্ধে ২০টি রিট মামলা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর কোনোটিই এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এর মধ্যে সাতটি রিটে আয়কর আইনের ১৪৩(৫) ধারায় করা জরিমানা এবং ১৩টি রিটে ২১২ ধারায় কর নথি পুনঃউন্মোচনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তানিম খান বলেন, যে কেউ আইন অনুযায়ী রিট করতে পারেন। এসব মামলায় করসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকতে পারে। আশা করছি, বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।